27 C
Dhaka
শনিবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২১, | সময় ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ

“রবিউল আউয়াল : মহামানব(সা.)-এর আগমন”

পৃথিবী যখন একটু অন্ধকার হয়ে আসত তখন মহান রাব্বুল আলামিন পৃথিবীর অন্ধকার দূর করতে আলো পাঠাতেন যেন অন্ধকার বিদূরীত হয় ৷ যুগে যুগে পাঠানো সেই আলোগুলো হল নবী-রাসূলগণ ৷ এমন এক সময়ের উপস্থিত হয় যখন পৃথিবী ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছিল ৷ সেই সময়ে আগমনকারী দিগদিগন্তে কিরণ ছড়িয়ে দেওয়া ব্যক্তিই হল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আলো, শ্রেষ্ঠ মহামানব ও শ্রেষ্ঠ রাসূল যিনি পৃথিবীর অরাজকতা, অনৈতিকতা, অশালীনতা ও অসহায়তার গ্লানি দূর করার পাশাপাশি অধিকার বঞ্চিতদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার নিমিত্তে এবং সৃষ্টির প্রতিটি প্রাণীর জন্য রহমতস্বরূপ পৃথিবীর একমাত্র অতুলনীয় ব্যক্তিত্বের মর্যাদায় উত্তীর্ণ এই মহামানব রবিউল আওয়াল মাসের ১২ (মতান্তরে ৯) ৫৭১ খ্রিষ্টাব্দে (৫৭০ খ্রি. প্রচলিত মত) সোমবার সুবহে সাদিকের সময় মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন ৷

এই মহান ব্যক্তির সূচনা লগ্নেও ছিলেন পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত ৷ মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায় পিতার বিদায়ের মূহুর্ত চলে আসে ৷ পিতৃস্নেহের কষ্ট বুকে নিয়ে বেড়ে উঠেন মায়ের মমতায় ৷ মাত্র ৬ বছর বয়সে পৃথিবীর সব থেকে কাছের মানুষ প্রিয় আম্মাজানকেও হারিয়ে বসেন ৷ এমন কনিষ্ঠ বয়সে দুই রত্নের (পিতা-মাতা) স্থলে দাদা আবদুল মুত্তালিবের দায়িত্বে লালিত-পালিত হন প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) ৷ মা হারানোর কষ্ট কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই উপস্থিত হয় দাদা হারানোর ভিন্ন কষ্টের ধাক্কা ৷ অতঃপর, ৮ বছর বয়সে দাদাকে হারিয়ে লালিত-পালিত হন চাচা আবু তালিবের তত্ত্বাবধানে ৷ ১২ বছর বয়সে চাচা আবু তালিবের সাথে সিরিয়ায় বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলে পথিমধ্যে পাদ্রী বুহাইরা রাসূল(স.) সম্পর্কে একটি ভবিষ্যতবাণী করে বলেন, “তিনি একজন মহামানব হবেন ৷ আমাদের ধর্মীয় গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী তিনি হবেন শেষ যামানার নবি ৷ তিনি নবি হওয়ার পেছনে আমি কিছু নিদর্শন দেখেছি ৷ সুতরাং তাঁকে সিরিয়ায় নিয়ে যাবেন না ৷ ইহুদীরা তাঁর ক্ষতি করতে পারে ৷” এই কথা শ্রবণ মাত্র চাচা আবু তালিব তাঁকে মক্কায় ফেরত পাঠান ৷ রাসূল (স.)-এর জন্ম থেকে যতগুলো শ্রেষ্ঠ মনীষী হওয়ার নিদর্শন প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে এই ভবিষ্যতবাণী ছিল অন্যতম ৷ এর পূর্বেও মা হালিমার কাছে থাকাকালীন মাত্র চার/পাঁচ(মতান্তর ৩) বছর বয়সে সিনাসাকের(বক্ষ বিদীর্ণ) ঘটনা ঘটেছিল ৷

রাসূল(স.) মাত্র ১৭ (মতান্তর ২৫) বছর বয়সে ইতিহাসের সেরা দৃষ্টান্ত শান্তিসংঘ (হিলফুল ফুজুল) প্রতিষ্ঠা করেন যা আজো মানবজাতিকে শান্তির পথ দেখিয়ে আসছে ৷ সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য হিলফুল ফুজুল অত্যন্ত গুরুত্বের দাবিদার ৷ সিরাত গ্রন্থ থেকে জানতে পারি, রাসূল(স.)-এর এই উদ্যোগ আরবের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত কার্যকরি ভূমিকা রেখেছিল ৷

রাসূল(স.) ২৫ বছর বয়সে বিবি খাদিজা(রা.)-কে বিয়ে করেন ৷ অতঃপর ৪০ বছর বয়সে নবুওয়াত লাভ করেন ৷ ২৭ রমযান, সোমবার হেরা পাহাড়ের গুহায় প্রথম কুরআন নাযিল হয় সূরা আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াত ৷ তিনি কুরআন নাযিল হওয়ার পূর্বে প্রায়ই হেরা গুহায় ধ্যান করতেন একাকী ৷ ওহি প্রাপ্ত হয়ে প্রথমে তিনি অত্যন্ত ভীত অবস্থায় ছিলেন তখন বিবি খাদিজা (রা.) তাঁকে শান্তনা দেন ৷ খাদিজা (রা.) ছিলেন রাসূল(স.)-এর সুখ-দুঃখ সব পরিস্থিতির একমাত্র কাছের মানুষ ৷ নবুওয়াত লাভের পর প্রথম ৩ বছর গোপনে ইসলাম প্রচারের কাজ করেন ৷ অতঃপর, ৪৫ বছর বয়সে নবুওয়াতের ৬ষ্ঠ বছরে চাচা হামজা (রা.) ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং ওমর(রা.)-ও এই বছরই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন ৷ শুরু হয় প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের কাজ ৷

রাসূল(স.)-এর বয়স যখন ৪৯ বছর অর্থাৎ নবুওয়াতের ১০ম বছরে চাচা আবু তালিব মৃত্যুবরণ করেন ৷ এই কষ্ট মেনে না নিতেই সবচেয়ে প্রিয় মানুষ খাদিজা (রা.)-এর বিদায়ও চলে আসে ৷ একটার পর একটা কষ্টের ধাক্কা উপস্থিত হয় রাসূল(স.)-এর জীবনে ৷ এতে তিনি এতটায় ব্যতীত হয়েছিলেন যে, কয়েকদিন ঘর থেকে বের হওয়ারও শক্তি পান নি ৷ তিনি চাচা আবু তালিব ও স্ত্রী খাদিজা(রা.)-কে হারিয়ে একেবারে একা হয়ে পড়েন ৷

অতঃপর, ৫০ বছর বয়সে অর্থাৎ নবুওয়াতের ১১তম বছর মহররম মাসে তায়েফে দাওয়াতী কাজে যান ৷ যে মানুষটা পথ হারা মানুষদের নাজাতের জন্য শরীর মোবারক থেকে রক্ত ঝরিয়েছেন ৷ শুধু এই মানুষগুলো যেন জাহান্নাম থেকে বাঁচতে পারেন ৷ তায়েফের মানুষদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়ে নির্মম ঘটনার সম্মুখিন হন প্রিয় নবি হযরত মুহাম্মদ (স.) ৷ যে ঘটনা প্রতিটি মুসলিম উম্মাহর চোখে পানি ঝরাতে বাধ্য করে ৷ তিনি এতটায় তায়েফ বাসীর নির্যাতনের শিকার হন যে, সহ্য করতে না পেরে স্বয়ং ফেরেস্তারা এসে রাসূল(স.) থেকে অনুমতি চাইলেন যেন তায়েফ বাসীকে মাটির সাথে মিশিয়ে ধ্বংস করে দেই ৷ কিন্তু রাসূল(স.) রহমতের নবী, দয়ার নবী বললেন, “ওদের যদি ধ্বংস করে দিই, তাহলে তো পরবর্তী প্রজন্মরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে পারবে না ৷ এরা না হয় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নি; পরবর্তী প্রজন্মরা যেন সত্যকে গ্রহণ করতে পারে ৷” আর তাই রাসূল(স.) তায়েফ বাসীকে ক্ষমা করে দেন ৷ আজ সেই তায়েফ বাসীরা রাসূল(স.)-কে নিয়ে গর্ব করে, তাঁর প্রতি সালাওয়াত পাঠ করে, তাঁর জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত থাকে ৷ আর এটাই ছিল রাসূল(স.) রাহমাতুল্লিল আলামিন হওয়ার শ্রেষ্ঠ উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ৷

রাসূল(স.)-এর কষ্ট একটু লাঘব করতে মহান আল্লাহ তা’য়ালা স্বয়ং তাঁর সাথে দিদার লাভ করাতে রাসূল(স.)-কে সপ্ত আসমানের উপর নিয়ে যান ৷ যাকে লাইলাতুল মি’রাজ(উর্ধ্বাকাশ ভ্রমণ) বলা হয় ৷ আর এই রাতেই মুসলিম উম্মাহর জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরজ করা হয় ৷ মক্কায় কাফের-মুশরিকদের নির্যাতনে অতিষ্ট হয়ে মহান আল্লাহর হুকুমে তিনি ৮ রবিউল আওয়াল বৃহস্পতিবার মদিনায় হিজরত করেন (আর এই সময় থেকে মুসলিমদের হিজরী সন গণনা শুরু হয়) ৷ পরবর্তীতে মদিনায় ইসলামের প্রচার প্রসার বিস্তার লাভ করে ৷ মানবজাতির জন্য ধীরে ধীরে যাবতীয় হুকুম-আহকাম ও দিক নির্দেশনা নাযিল হয় ৷ আর ইসলাম প্রচার প্রসারে কাফেরদের সাথে বদর, উহুদ, খন্দক, খায়বার, তাবুক ইত্যাদি নানা যুদ্ধবিগ্রহের ঘটনা ঘটে ৷ মোট ৮৫টি যুদ্ধ অভিযানের কথা রেকর্ড করা হয়েছে, তন্মধ্যে স্বয়ং রাসূল(স.) স্বশরীরে ২৭টি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন যা গাজওয়া নামে পরিচিত ৷

রাসূল(স.) ছিলেন অত্যন্ত সুঠাম দেহের অধিকারী ৷ তাঁর দেহে ছিল জান্নাতি ৪০ জন নওজুয়ানদের সমপরিমাণ শক্তি ৷ তিনি অতিরিক্ত লম্বা ছিলেন না এবং অতিরিক্ত খাটোও ছিলেন না ৷ তিনি ছিলেন মাঝারি আকৃতির ৷ বিভিন্ন কারণে আল্লাহর নির্দেশে তিনি ১১ কিংবা ১৩ টা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন(তবে, তিনি ব্যতীত অন্যদের জন্য চারটি বিবাহ করা জায়েয) ৷ বিবাহিত স্ত্রীদের মধ্যে একমাত্র কুমারী ছিলেন হযরত আয়েশা (রা.) ৷ রাসূল(স.) ৫৪ বছর বয়সে তাঁর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন ৷ তাঁর জীবন জুড়েই রয়েছে সমগ্র মানবজাতীর জন্য অনুপম আদর্শ ৷ এই মহামানব অন্ধকার যুগকে আলোতে ফিরিয়ে এনেছিলেন ৷ পূর্বে নারী জাতি ছিল সবচেয়ে অবহেলিত এবং সবচেয়ে অপদস্থ ৷ তারা একমাত্র ভোগের সামগ্রী হিসেবে বিবেচিত ছিল ৷ রাসূল (স.)-এর মাধ্যমে নারী জাতির মর্যাদা আল্লাহ তা’য়ালা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেন ৷ রাসূল (স.)-এর সাথে একবার কেউ কথা বললে সে মুগ্ধ হয়ে যেতেন ৷ তাঁর হাত ছিল অত্যন্ত কোমল ৷ কেউ একবার মুচাফাহা করার সুযোগ পেলে আর হাত ছাড়তে চাইতেন না ৷ তিনি যখন কুরআন তিলাওয়াত করতেন তখন গোপনে গোপনে ইসলামের ঘোর শত্রুরাও তাঁর তিলাওয়াত শুনতে উঠে পড়ে লাগতেন ৷ রাসূল(স.)-এর ঘামের গন্ধ ছিল মিশক আম্বরের চেয়েও অতি সুগন্ধময় ৷ পৃথিবীর একমাত্র অনন্য ব্যতিত্ব সম্পন্ন প্রিয় রাসূল (স.) যার প্রশংসা করা হয় না এমন কোনো মূহূর্ত নেই ৷ অমুসলিমরাও তাঁর প্রশংসা করতে বাধ্য ৷ যুগে যুগে অমুসলিমরাও তাঁর সাক্ষ্য রেখে গেছেন ৷ মাইকেল এইচ হার্ট তিনি একশ মনীষীর জীবনীর উপর একটি গ্রন্থ রচনা করেন এবং রেংকিংয়ে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে যার নাম প্রথমে রেখেছেন তিনি হলেন আমার নবী, আপনার নবী, প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) ৷ এইভাবে শতশত নজির ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে ৷

বিশাল এই আকাশ ও জমিনে যিনি একমাত্র শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত ৷ যার প্রশংসা স্বয়ং মহান আল্লাহ তা’য়ালা নিজেই করেছেন ৷ প্রিয় রাসূল (স.) সমগ্র বিশ্বের প্রতিটি সৃষ্টিকে একা করে ৬৩ বছর বয়সে ১১ হিজরী ১২ রবিউল আওয়াল মোতাবেক ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে ৭ জুন সোমবার দুপুরের কাছাকাছি সময়ে হযরত আয়েশা(রা.)-এর ঘরে তাঁর কোলে মাথা রেখে অফাত বরণ করেন ৷

বর্তমান মুসলিমদের মধ্যে কিছু কিছু বিদ’য়াত প্রচলিত রয়েছে রাসূল(স.)-এর জন্ম তথা মিলাদ পালন নিয়ে ৷ মিলাদ পালন করতে গিয়ে নানা প্রকৃতির মিষ্টি খাওয়া, কেক কেটে মিলাদ উদযাপন, হালুয়া-রুটি খাওয়া ও যৌতভাবে কিছু মনগড়া নিয়মনীতির অনুসরণের মাধ্যমে চরম বিদ’য়াতে লিপ্ত অজ্ঞ মুসলিম ভাইয়েরা ৷ সিরাহ ও হাদীস গ্রন্থ থেকে জানা যায়, রাসূল(স.) প্রতি সোমবার জন্মের শুকরিয়া স্বরূপ একটি করে রোজা রাখতেন ৷ যদি আমরা তাঁর জন্মের খুশিতে খুশি উদযাপন করি, তাহলে অবশ্যই রাসূল(স.)-এর অনুসরণের মাধ্যমে সোমবার রোজা রেখে মিলাদ পালন করা হলো প্রকৃত খুশি ৷

মুসলিম ও অমুসলিম সকলের জন্য রাসূল(স.) একজন অনন্য আইকন ও আদর্শ ৷ বিশ্বের বিস্ময় হযরত মুহাম্মদ(স.)-এর আদর্শ (কুরআন ও হাদীস) অনুসরণের মাধ্যমে আল্লাহ তা’য়ালা ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তির পথ লাভ করার তৌফিক দান করুক ৷ আমিন !

লেখক: আবদুর রশীদ
শিক্ষার্থী, সরকারি সিটি কলেজ চট্টগ্রাম
সদস্য, বাংলাদেশ নবীন লেখক ফোরাম

আরও পড়ুন...

ওজুর পানিতে মুছে যায় যেসব গোনাহ

Staff correspondent

দেনমোহর হিসাবে স্বামীর কাছে কেবল ৫ ওয়াক্ত নামাজই চাইলেন স্ত্রী

Staff correspondent

ছালাতুস তাছবীহ নামাজ পাঠের ফজিলত জেনে নিন!

Staff correspondent
bn Bengali
X