27 C
Dhaka
শনিবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২১, | সময় ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ

“ভুল সংশোধনে রাসূল (সা.)-এর হিকমাহ ও আন্তরিকতা”

মহান আল্লাহ তা’য়ালা মানবজাতির সৃষ্টির সূচনা করেন হজরত আদম (আ.)-এর মাধ্যমে ৷ পরে আদম (আ.)-এর জীবন সঙ্গিনী হাওয়া (আ.)-কে সৃষ্টি করেন ৷ পৃথিবীতে সৃষ্টির সেরা জীব হল মানবজাতি ৷ আর এই মানবজাতির প্রথম ব্যক্তি হজরত আদম (আ.)-ও প্রথমবারের মতো নিষিদ্ধ গাছের ফল ভক্ষণের দরুন ভুল করে বসলেন জান্নাতে ৷ আর ভুলের নিমিত্তে দুনিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং শুরু হয় দুনিয়ায় মানবজাতির জীবন পরিচালনা ৷ এছাড়াও হজরত আদম (আ.)-এর পুত্র কাবিল তার নিজ ভাই হাবিলকে হত্যার মাধ্যমে একটি জঘন্য ভুল করেছিলেন ৷ এই ভুলটিই পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম হত্যাকাণ্ড হিসেবে পরিচিত ৷ মানব সৃষ্টির সূচনা হতে প্রতিনিয়ত নিত্য নতুন ভুলের সূচনা হয়ে চলছে ৷ কোনোটা সামান্য আবার কোনোটা জঘন্য ৷ ভুল সাধারণত একটি স্বাভাবিক বিষয় ৷ হতে পারে ভুলটি জিনা, হাত্যা, চুরি, ডাকাতি অথবা কথাবার্তায় কিংবা আচরণে অন্যকে কষ্ট দেওয়া ইত্যাদি ৷

ভুল যেমন রয়েছে, তেমনি সংশোধনও রয়েছে ৷ ইসলাম প্রতিটি ভুলের সংশোধন দিয়েছেন নিপূণভাবে ৷ প্রতিদিন আমরা কোনো না কোনো ভুল করে ফেলি ৷ কিন্তু কেউ কোনো একটা ভুল করে বসলে আমরা সাধারণত তাকে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে সংশোধন করে দিই না; বরং ধমক দেওয়ার পাশাপাশি তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথাও বলে বসি ৷ আজ বড় কিংবা জঘন্য কোনো ভুল নিয়ে কথা বলছি না, বলছি নিত্য নৈমিত্তিক সূচিত হওয়া ছোট-ছোট ভুলের কথা ৷ ভুল সংশোধনে প্রিয় রাসূল (সা.)-এর আচরণ ছিল অত্যন্ত হিকমাহ ও আন্তরিকপূর্ণ ৷ একবার রাসূল (সা.) হজরত আনাস (রা.)-কে বললেন, “আনাস, তুমি কি এ কাজটা করতে পারবে? আনাস (রা.) বললেন- না, আমি পারবো না (আনাস (রা.) তখন ছিলেন ছোট ) ৷ এ কথা শুনে রাসূল (সা.) মূচকি হাসলেন এবং সেখান থেকে চলে গেলেন ৷ হজরত আনাস (রা.) দীর্ঘ দশ বছর রাসূল (সা.)-এর খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন ৷ পরবর্তীতে হজরত আনাস (রা.) বলেন, ” ঐ দিন রাসূল(সা.)-এর মূচকি হাসিই ছিল আমার জন্য সবচেয়ে বড় শাস্তি ৷ আমার জীবনে আর কোনো এমন ভুল দ্বিতীয়বার হয়নি ৷ এছাড়াও যে কোনো ভুল হলে, “তুমি এটা কেন করলে?” এমনটিও তিনি বলতেন না ৷ এমনকি রাসূল(সা.)-এর খেদমতে কাটানো দীর্ঘ দশ বছরে রাসূল(সা.) আমার প্রতি একটি কটু বাক্যও ব্যবহার করেন নি ৷

এক কুরাইশ সাহাবী (রা.) এসে রাসূল (সা.)-এর নিকট অনুমতি প্রার্থনা করে বললেন- “ইয়া রাসূলুল্লাহ(সা.), আপনি আমাকে জিনা করার অনুমতি দিন ৷” তখন মজলিসে থাকা অন্য সাহাবীগণ রেগে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন ৷ কিন্তু রাসূল (সা.) অত্যন্ত আন্তরিকপূর্ণ হিকমার সাথে যুবককে কাছে এনে বললেন- “হে আমার সাহাবী শুনো, এমনটি তোমার মায়ের সাথে হউক তা কি চাও? সে জবাবে বললেন, ‘না’ ৷ অতঃপর, রাসূল(সা.) বললেন- তোমার কন্যা বা বোনের সাথে হউক এমনটি চাও? সে পুনরায় জবাবে বললেন, ‘না’ এবং অন্যরাও তা চাইবে না ৷ অবশেষে যুবক সাহাবী নিজের ভুল বুঝতে পারলেন ৷ অতঃপর, রাসূল(সা.) যুবক সাহাবীর হাত ধরে দু’য়া করে বললেন, ‘আল্লাহ, যুবকের পাপকে ক্ষমা করে দিন, তার অন্তরকে পবিত্র করুন এবং তাকে সহিষ্ণু করুন (তার  এমন কামনার বিরুদ্ধে) ৷” উক্ত ঘটনার প্রতি ভালো করে লক্ষ্য করুন, যুবকটি স্বয়ং রাসূল(সা.)-এর নিকট জঘন্য একটি পাপ কাজের (জিনা) অনুমতি চাওয়াতে রাসূল (সা.) রেগে যান নি এবং ধমকও দেন নি; বরং অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে কাছে টেনে হিকমার সাথে বুঝিয়েছেন এবং তার ভুলকে সংশোধন করেছেন ৷

এছাড়াও বিভিন্ন হাদীসের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, ভিন্ন ভিন্ন হাদীসে ভিন্ন ভিন্ন উত্তম কাজের কথার উল্লেখ রয়েছে, যা সাধারণত হাদীসের মাঝে বৈপরীত্য আছে বলে মনে হয় ৷ কিন্তু প্রকৃত অর্থে কোনো বৈপরীত্য নেই ৷ এর কারণ রাসূল(সা.) সাহাবীর চরিত্রের উপর ভিত্তি করে হিকমার সাথে শিক্ষা দিতেন ৷ অর্থাৎ, কোনো সাহাবী রাসূল(সা.)-এর নিকট এসে যদি জিজ্ঞেস করতেন, ‘কোন কাজটি সর্বোত্তম?’ তখন রাসূল (সা.) সাহাবীর চরিত্রে কোন বৈশিষ্ট্যের অভাব তার প্রতি লক্ষ্য করে বলতেন, অমুক কাজটি উত্তম ৷ ফলে ওই সাহাবী নিজের জীবনে ঘাটতি থাকা আমলকে পূরণ করার প্রচেষ্টা শুরু করে দিতেন ৷ এইভাবে রাসূল(সা.) প্রত্যেকের ভুল সংশোধন করতেন অত্যন্ত হিকমার সাথে ৷ তিনি বলতেন না যে— তোমার এই সমস্যা, ওই সমস্যা কিংবা তুমি এই ভুলটি করছ বা ওই ভুলটি করছ; বরং হিকমার সাথে বলতেন এই কাজটি করা সবচেয়ে উত্তম এবং ওই কাজটি সবচেয়ে ঘৃণ্য ৷ ফলে সাহাবীগণ ভুলের উপর থেকে অতি সহজে সরে দাঁড়াতে সক্ষম হতেন ৷

বর্তমান সময়ে দেখা যায়, পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন অফিস-আদালত ও দোকানের কর্মচারীর ভুলের দরুন মালিক অত্যন্ত কটু বাক্য ব্যবহার করে থাকে, ধমক দিয়ে থাকে এবং প্রহার করে বসে ইত্যাদি ৷ এমনটা করা কোনোভাবেই সমীচীন নয় ৷ মনে রাখবেন, কাউকে সরাসরি আঘাত দিয়ে কথা বললে কিংবা ভুল সংশোধনের উদ্দেশ্যে বললেও মাঝেমাঝে তা হিতে বিপরীত ঘটে ৷ তাই রাসূল(সা.)-এর আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে ভুলকে সংশোধন করার চেষ্টাতে রয়েছে সাফল্য ৷ সুতরাং, কারো দ্বারা কোনো ভুল সংঘটিত হলে আমরা যেন তাকে অত্যন্ত অন্তরিকপূর্ণ হিকমার সাথে বুঝিয়ে বলি যে— আপনি এমনটি করলে আরো ভালো হতো বা আপনি চাইলে এই পথ অবলম্বন করতে পারতেন কিংবা আপনার কাজে আরো সেন্সিটিভ হওয়া বাঞ্চনীয় ইত্যাদি বিভিন্ন উপায়ে ভুল সংশোধনে হিকমাহ অবলম্বন করা উচিত ৷ এরূপ যদি আমরা প্রতিটি ভুলের সংশোধনে হিকমাহ অবলম্বন করতে পারি, তাহলে অবশ্যই আল্লাহ তা’য়ালা পরিবার, সমাজ ও দেশের মধ্যে আরো বেশি শান্তি ও সম্পৃতি দান করবেন এবং খুব সহজে মানুষ নিজের ভুল থেকেও সরে দাঁড়াতে পারবে ৷ আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সঠিক বুঝার ও আমল করার তৌফিক দান করুন ৷ আমিন !

লেখক: আবদুর রশীদ
শিক্ষার্থী, সরকারি সিটি কলেজ চট্টগ্রাম
সদস্য, বাংলাদেশ নবীন লেখক ফোরাম

আরও পড়ুন...

ঈদের নামাজের তারতীব!

Al Mamun Sun

মনের ভয় কিভাবে দূর করবেন জেনে নিন!

Al Mamun Sun

পবিত্র শবে বরাত এর ফজিলত ও ইবাদত!

Staff correspondent
bn Bengali
X