28 C
Dhaka
রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২০, | সময় ৩:৩২ পূর্বাহ্ণ

পুরষ্কার

রাবি প্রতিনিধি:

ঘড়িতে ঢংঢং ঘণ্টার আওয়াজ হলো। বাড়িতে পুরোনো জিনিস পত্রের মধ্যে এই ঘড়িটার বয়স বেশি। অলকা দেবী তার বাবার কাছ থেকে পেয়েছিলেন। বাবার দেওয়া উপহার অলকা দেবী খুব যত্ন করেন।তাইতো আজ ও ঘড়িটা সঠিক সময় দিচ্ছে।

মা অলকা দেবী আজ ঘুমোননি। তিনি বারান্দায় দরজার কাছা কাছি বসে আছেন। ঘড়িতে দেখলেন রাত এক’টা বাজে। টেবিলে বসে মেয়ে বই পড়ছে।  চারপাশে চুপচাপ। কোথাও যেন কোন সাড়াশব্দ নেই। আশে পাশে কোন বাড়িও নেই। মা মেয়ের ছোট একটি ঘরে অজপারা গায় বসবাস। ঘরের দেয়ালের পাশে ঘুগরী পোকা নিজ মনে অবিরত গান গাইছে । তাছাড়া রাতে এ সময় কম মানুষই জেগে থাকে। তাই অলকা দেবী  শুধু মেয়ের বই পড়ার শব্দ ছাড়া অন্য কিছুই যেন শুনতে পাচ্ছেন না। ওদিকে  মাঝরাত কখন হয়ে গেছে সেদিকে তাঁর মেয়ে উমার খেয়াল নেই। পুরো মনোযোগটাই যেন পড়াশুনায়। কারণ সকাল হলেই মেট্রিকুলেশন পরিক্ষা দিতে যেতে হবে। উমা ২য় বার দশম শ্রেণি পরিক্ষা দিচ্ছে। প্রথমবার পরিক্ষায় তিন বিষয় অনুত্তীর্ণ হয়। অনুত্তীর্ণ হওয়ার একটা বিয়োগান্তক কারণও আছে।

গত বছর এ সময় তিনটি পরিক্ষা সম্পন্ন হওয়া বাকি থাকাতেই তার বাবা নিবারণ চন্দ্র গত হন। নিবারণ চন্দ্র কঠিন ক্যন্সার রোগে আক্রান্ত ছিলেন। রোগটা যেন তাকে স্বাভাবিকতায় ফিরতে দিতে চায়নি। নিবারণ বাবুর শরীর রোগের সাথে যুদ্ধ করে হয়তো হাপিয়ে গেছে। তাই স্ত্রী মেয়েকে এই ধরায় রেখে ইহলীলা সংবরণ করলেন। যেদিন সকালে তিনি গত হন উমার সেদিন  উচ্চতর গণিত পরিক্ষা ছিলো। একদিকে বাবাকে হারানো শোক অন্য দিকে মাধ্যমিক পরিক্ষা। অলকা দেবী আর উমা নিবারণ বাবুর পাশে বসে অঝরে কাঁদছে। দুজনের চোখ থেকে অবিরত জল পড়ছে। কাঁদছে আর বাবাকে জাগিয়ে তোলার তুমুল চেষ্ঠা। কিন্তু বৃথা যায় এই পরিশ্রম। কারণ নিবারণ চন্দ্র আর ঘুম থেকে জেগে উঠেনি।  উমা’র কপল দিয়ে কান্নার জল নদী মতো বয়ে চলছে এক শূণ্যতা নিয়ে।

সেই নদীর জলে ছিলো বাবা মেয়ের ভালোবাসা, রাগ, শাসন, অভিমান যেন সব মিশে আছে। বাবা বেঁচে থাকা মানে পরিবার তথা সন্তানের একটা ছাদ হয়ে থাকা। বাবা মানে ত্যাগী মানুষ। বাবা মানে আদর ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। বাবা মানে শাসন। বাবা মানে পরিবারের মেরুদন্ড। প্রকৃতির নিয়তি তাকে টেনে নিয়ে গেলো। পুরো বাড়ি যেন অন্ধকারে ডুবে গেলো। এরপর রীতি অনুযায়ী নিবারণ বাবুর সৎকার করা হয়। অন্যদিকে উমার সেদিনের পরিক্ষার সময় ঘনিয়ে আসে। উমা আর পরিক্ষা দিবে না বলে ভেবেছে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা যা নিয়ে যাবার তা তো নিয়ে গেছে। সেই শোকে একটি বছর হারানো উচিত হবে না। তাই তার কাকাতো বোন এবং ভাইয়েরা অনেক বুঝিয়ে পরিক্ষা দিতে রাজি করালো। শংকর দাদা উমাকে পরিক্ষা দিতে নিয়ে যায়। কিন্তু পরিক্ষার হলে উমার মনের মধ্যে বাবাকে হারিনোর বিশাল এক শূন্যতা নিয়ে থাকে। যা তাকে থেকে থেকে থেকে কাঁদিয়ে তোলে। যথারীতি সে দিনের পরিক্ষা খারাপ হয় সাথে পরের দুটো পরিক্ষাও। এটা অস্বাভাবিক কিছু ছিলো না।

তিন মাস পর ফলাফল বের হয়। উমা তিনটে বিষয় অকৃতকার্য হয়। এতে উমা খুব বড় আঘাত পেয়েছে তা নয়। এর থেকেও বড় আঘাত সে আগেই পেয়েছে। মনের মধ্যে প্রতিজ্ঞা করে পড়ালেখা করে সে অনেক বড় হবে। তাই অনুত্তীর্ণ হয়েছে একথা তার যেন মনেই নেই। পাড়ার লোকে অনেকে অনেক কথা বলে। কিন্তু মেয়ের যেন কোন যায় আসে না। বড় দাদা তপন বলেছিলো, উমা এবার পাশ করতে পারবি তো? উত্তরে উমা বলেছিলো, জ্ঞানীরা তো বলে গেছেন ‘একবার না পারিলে দেখ শত বার’।

পরিবারে এখন মা অলকা দেবী আর মেয়ে উমা ছাড়া আর কেউ নেই।  

সেবারেই উমাকে তাঁর মা বিয়ে দেওয়ার জন্য তোরজোর করে। কিন্তু মেয়ে উমার ঐ এক কথা সে এখন বিয়ে করবে না। পড়াশুনা করবে। অজানা সব কিছু জানবে। ভালো মাইনের চাকরি করবে। মাকে নিয়ে সে ঘুরতে যাবে।পরিবারের অভাব দূর করবে।  বাবার ধার দেনা শোধ করবে

কিন্তু এবার  পরিক্ষায় পাস করতে না পারলে বিয়ে করতে হবে।  মা অলকাও চায় মেয়ের বিয়ে দিতে।  তাঁর বাবা থাকলে হয়তো তিনিই মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করতেন। মেয়ের বয়স হয়েছে।  এতো বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়ে একটি দায়িত্ব সেরে ফেলতে চান। যদিও কোন মা ই চান না নিজের মেয়েকে পেটে দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করে, খাইয়ে পড়িয়ে বড় করে অন্যের বাড়িতে পাঠাতে। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মেয়েককে বিয়ে দিয়ে স্বামীর ঘরে পাঠাতে হয় । আর উমা এ বয়সে কখনই বিয়ে করবে না। এ থেকে বাঁচতে একটা উপায় বাকি পরিক্ষায় পাস। তাই রাত জেগে হলেও বই পড়তে হবে।

রাত দেরটায় উমা ঘুমানোর জন্য শুয়ে পড়ে। সাথে তার মা অলকা দেবীও। উমা ও তার মা এক বিছানায় ঘুমায়। বিছানায় শুয়ার পর  উমা এক পাসে কাত হয়ে তার মাকে জিঙ্গাসা করলো,  আজ বাবা থাকলে তিনি সুস্থ হয়ে যেতেন তাই না, মা? আমাকে পরিক্ষার হলে দিয়ে আসতেন।

  মা বললেন, তুই পরিক্ষা গুলো ভালো করে দিয়ে পাস কর। তোর বাবার সাথে দেখা করতে যাবো আর সাথে মিষ্টি নিব। 

ভোর ৬টার ঘণ্টা পড়লো। উমা ঘুম থেকে উঠে ফ্রেস হয়ে পড়তে বসে। একটু পরে মা চা দিয়ে যায়। ঘণ্টা খানেক পড়ে রিভিশন শেষ হলো।  ওদিকে অলকা দেবী পাতিলে করে চুলোই চাল উঠিয়ে দিয়েছেন। সাথে ডাল আর দুটো আলু দিয়েয়েছেন যাতে মেয়ে খেয়ে পরিক্ষা দিতে যেতে পারে।

উমা গোসল করে এসে খেতে বসেছে। উমা বললো, তাড়াতাড়ি খেতে দাও। পরিক্ষার সময় হয়ে গেছে। মা সেদ্ধ আলু ও ডালের সাথে ঝুরি ঝুরি পেয়াজ কেটে, সর্ষের তেল দিয়ে ভর্তা করেছে তা দিয়েই মেয়েকে খেতে দিলো।

উমা মাকে প্রাণাম করে পরিক্ষা দিতে গেলো। পরিক্ষার আসনে বসে উমার গত বছরের কথা মনে পড়ছে। সে এক সময় লক্ষ্য করে তার চোখে জল চলে এসেছে। উমা বুঝতেই পারেনি কখন তার হ্রদয়ের বাধ ভেঙ্গে চোখ জলে ভর্তি হয়ে গেছে। কেউ যাতে বুঝতে না পারে তাই তাড়াতাড়ি নয়ন দুটি মুছে ফেলে। কিছুপড়ে পরিক্ষা শুরু হয়।উমা সব ভুলে মনযোগ দিয়ে ভালো ভাবেই পরিক্ষা শেষ করে। এরকম ভাবে সব পরিক্ষা ভালো ভাবেই শেষ করে।

পরিক্ষা শেষে তিন মাস পর ফলাফল বের হয়। উমা স্কুলে ফলাফল আনতে যায়। বিদ্যালয়ের নোটিস বোর্ডে ফলাফল টাম্গিয়ে দেওয়া হয়েছে। উমা তার ফলাফল খুজতে থাকে ২৯৫…। সে তার ফলাফল খুঁজে পায় এবং খুব আনন্দে চোখের জল নিয়ে বলতে থাকে বাবা আমি পরিক্ষায় পাস করেছি। এমন আনন্দের দিনে কজনে চোখ ভিজিয়ে ফেলতে পারে। বাসায় আসে উমা মা মা বলে ডাকতে শুরু করেছে। মা কলপার থেকে বলছে, কি হয়েছে এতো জোড়ে চিৎকার করছিস কেনো? ওমনি উমা কলপারে গিয়ে মা অলকা দেবীকে জরিয়ে ধরলো এবাং দু বার আবর্তন করে কাঁপানো গলায় মাকে বলে মা আমি ফাস্ট ডিভিসন পেয়ে পরিক্ষায় পাস করেছি মা। এ কথা শুনে মায়ের ও যেনো চোখে জল চলে আসে।খুব ভালো করেছিস। বিছানার নিচে দু’শ টাকা আছে মিষ্টি নিয়ে আয়। আর এখন ছাড়তো আমাকে আমার অনেক কাজ পড়ে আছে। মায়ের কপলে একটা চুমু খেয়ে উমা চলে আসে। মিষ্টিও নিয়ে আসে। 

বিকেলে বাবা নিবারণ বাবুকে যেখানে দাহ করা হয়েছিলো সেখানে যাবে একটিবার ঠিক করেছে। আজতো বাবার সাথে দেখা করতে যেতেই হতো। বিকেলে উমা তার মা অলকা দেবী সেনুয়া নদীর তীরে নিবারণ বাবুর সাথে দেখা করতে গেলো। মনের বিশ্বাস নিবারণ বাবু বুঝি এখনও এখানেই আছে। স্ত্রী মেয়ের জন্য অপেক্ষা করছে কখন তারা আসবে। আর তাকে মা উমার সুখবর জানাবেন। মা মেয়ে কিছু ফুল, ফল ও মিষ্টি এনেছে। কলা পাতার উপরে সব গুলো দিয়ে পাশে তারা দারিয়ে আছে। অলকা দেবী মনে মনে বলছে, ওগো তোমার মেয়ে পরিক্ষায় পাস করেছে দেখো। সাথে মিষ্টিও এনেছে। বলতে বলতে চোখের কোণ ভিজে যায়। আবার বলে, তোমার মেয়ে এতো ভালো ফলাফল করলো তুমি তাকে কিছু দিবে না। কিছুক্ষণ এভাবে থেকেই তারা বাড়ি চলে আসে। আসার আগে অলকা দেবী উমাকে বলে, তোর বাবা বেঁচে থাকলে, তোকে দামী কিছু উপহার দিতেন। আজ তিনি নেই তাই এখান এক মুঠো মাটিই নে।  যেটা তোর ভালো ফল করার জন্য তোর বাবার দেওয়া শ্রেষ্ঠ পুরষ্কার হিসেবে তোর কাছে থাকবে সারাজীবন। 

স্বজন কুমার রায়

গনযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন...

রাবিতে কৃতী শিক্ষার্থীরা পাবে বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদক

Staff correspondent

নোবিপ্রবিতে ছায়া জাতিসংঘ সম্মেলন শুরু আগামীকাল 

Staff correspondent

প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি মানবিক আবেদনঃ ‘দারিদ্র্যমুক্ত কুড়িগ্রাম বাস্তবায়ন কমিটির’ 

Staff correspondent
bn Bengali
X